প্রতিযোগীতা
বর্দ্ধমানের রাজসভাতেও এক ভাঁড় ছিল। নাম তার নেপাল। সে সকলের কাছে বলত- গোপালের চাইতে তার বুদ্ধি অনেক বেশি, গোপালকে একবার সামনে পেলে সে তাকে বোকা বানিয়ে দিতে পারে কি না পারে, দেখা যাবে একবার। দৈবক্রমে একসময়ে গোপাল মহারাজের দরবার থেকে বর্দ্ধমান রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত।
বর্দ্ধমান রাজ যখন শুনলেন গোপাল এসেছে, তখন তিনি খুশি হয়ে বললেন, তুমি এসেছ, বড় ভাল হয়েছে। আমার ভাঁড়টি সর্বদাই তোমার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকে। এবার প্রমাণ হবে- সে বড়, না তুমি বড়। প্রতিযোগীতায় তুমি আমার-ভাঁড়কে হারাকে পারলে আশাতীত পুরষ্কার পাবে। নেপালের সঙ্গে এটে উঠতে পার কিনা দেখি। সে জিতলে সেও পাবে।
গোপাল ঈষৎ হেসে বললে, হুকুম করুন, কি করতে হবে।
রাজা বিচারের ভার দিলেন মহামন্ত্রীর উপর। বিজ্ঞ মহামন্ত্রী গোপাল এবং বর্দ্ধমানের ভাঁড় নেপাল দুজনকে ডেকে বললেন, তোমরা প্রত্যেকেই তিনজন করে লোক সংগ্রহ করবে ও তাদের কাল সকালে রাজসভায় হাজির করবে। ওই তিনজনের ভিতর একজন হবে দরিয়ার এ পারের লোক, একজন ওপারের , আর একজন মাঝ দরিয়ার লোক।
যে আজ্ঞে। বলে গোপাল এবং বর্দ্ধমানের ভাঁড় নেপাল দুজনেই বিদায় নিলে।
নেপাল ভাবল এবার আমি গোপালকে ঠকাবই ঠকাব, সে মুচকি হেসে নাচতে নাচতে বিদায় নিল। নেপাল পরদিন ভোরে নদির ঘাটে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে নদির এপার থেকে একজন, নদির ওপার থেকে একজন এবং মাঝনদীর নৌকার উপরে থেকে একজন লোককে ডেকে আনলে রাজার নাম করে এবং তাদের সভায় এনে হাজির করলে। তিনজন লোকত ভয়ে অস্থির। আমরা কোন দোষ করিনি বাবু, আমাদের কেন রাজসভায় নিয়ে এলেন। আমাদের কি দোষ ধরে নিয়ে এলো?
গোপালও যথাসময়ে রাজসভায় এসে হাজির হলো, তারও সঙ্গে তিনজন লোক, একজন তার ভিতর ভটচাজ ঠাকুর, একজন সন্ন্যাসী, একজন নারী। তাদের নিয়ে সে সভার একপাশে চুপ করে বসে রইল।
বর্দ্ধমানের ভাঁড় রাজা ও মন্ত্রীকে সন্বোধন করে বললে, হুকুমমত আমি এই তিনজন লোককে এনে হাজির করেছি। প্রথম লোকটি ছিল নদীর এপারে, দ্বিতীয় লোকটি ছিল নদীর ওপারে, এই তৃতীয় লোকটি মাঝ নদীতে নৌকার ওপরে ছিল। যদি বিশ্বাস না হয় এদেরকে জিজ্ঞসা করে দেখুন আমি সত্যি বলছি, না মিথ্যা বলছি ওরাই সে কথা বলবে।
তারপর গোপালকে বলা হল, সে যাদের এনেছে তাদেরকে সামনে উপস্থিত করার জন্য। গোপাল জানাল এদেরকে বহুকষ্টে অনুনয় বিনয় করে রাজসভায় উপস্থিত সে করেছে। কেউই প্রথমে রাজসভায় আসতে চায়নি। বিশেষ করে সন্ন্যাসী ঠাকুর কোনমতেই রাজসভায় আসতে নারাজ গোপালের কথাবর্তায় সন্তুষ্ট হয়ে উনি রাজি হয়েছেন। পরিচয় দেবার জন্যে গোপাল করষোড়ে নিবেদন করলেন, মহান মহারাজ। মহামান্য মহামন্ত্রী এবং সভাসদগণ। এই যে তিনজনকে আমি রাজসভায় নিয়ে এসেছি, এরা কেউ আজ দরিয়া বা নদীর দিকে যান নি। কারণ আমার মনে হয়নি যে সুবিজ্ঞ মহামন্ত্রী দরিয়া বা নদী অর্থে বলতে সামনের গঙ্গানদী বুঝিয়েছেন। আমি অন্তত মহামন্ত্রীর নদি অর্থে এখানে বুঝেছি-ভব নদি। আমার অনুমান অভ্রান্ত মনে করে তাই এপার ওপার ও মধ্যস্থানের এক একটি লোক এনে রাজসভায় বহুকষ্টে হাজির করেছি…. এই যে ভট্চাজ্ ঠাকুর ইনি চাইছেন কি করে দেশে এর পান্ডিত্যের খ্যাতি দিনদিন ছড়িয়ে পড়বে, কি করে বেশ দুপয়সা উপার্জ্জন হবে, কি করে যশে মানে ধনে ইনি দেশও দশের ভিতরে একজন মহামান্য হয়ে উঠতে পারবেন। সম্পূর্ণভাবে ইহকাল নিয়েই ইনি ব্যস্ত আছেন। এক কথায় বলা যায় ইনি এ পারের লোক। এ পারের লোক এ ধরণের ছাড়া আমার অন্য কাউকে মনে হয় না। ….. আর এই যে সন্ন্যাসী ঠাকুর, ইনি ইহকাল নিয়ে মাথা ঘামান না মোটেই। সর্বদাই ভগবানের ধ্যানে-বিভোর কি করে ভগবান দর্শন করবেন সেই নিয়ে তন্ময়, খেতে দিন খাবে খেতে না দিন খাবে না, সুতরাং এদেরকেই বলা যায়, ও পারের লোক। …. আর এই যে, তৃতীয়টি, ও হল এই নগরের একটি বেশ্যা। বেশ্যা হইকালের কথাও ভাবে না, পরকালের কথাও ভাবে না। সে ইহকাল-পরকাল বলতে কিছুই বোঝে না। সে এপারের লোকও নয়, ওপারের লোকও নয়। অর্থাৎ সে মাঝ নদির লোক। এই আমার তিনজন লোকের পরিচয়। মহামন্ত্রীর আদেশমত কাজ করতে পেরেছি কিনা, এইবার সভাতা যাচাই করুন। আমার আর এর বেশি কিছুই বলার নেই। আপনারা সকলেই ভেবে বিচার করে দেখুন। ঠিক হয়েছে কিনা। সেটা আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম।
সভায় ধন্য ধন্য রব উঠল। রাজা মহামন্ত্রী বললেন, গোপালের মত বুদ্ধিমান লোক ভাড়েদের ভেতর দূরের কথা বড় বড় পন্ডিত সমাজে দুর্লভ। নেপালেরও অহঙ্কার সেদিন থেকে দূরে গেল। রাজা এবার গোপালকে প্রচুর পুরষ্কার সহ বিদায় দিলেন। গোপাল শুধু সুরদিক ভাঁড় নয় শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মহাপন্ডিতও বটে- দিকে দিকে তার এই গুনের কাহিনী ঘোষিত হল। কৃষ্ণনগরে মহারাজ ও গোপালের এই কাহিনীগুলোর গুনের কদর করতে ভুললেন না। সেদিন থেকে নেপাল গোপালের বন্ধু হয়ে গেল।
তুমি চুরি করেছ
একদিন রাজবাড়ির লোক গোপালকে চুরির দায়ে ফেলার জন্য জোর চেষ্টা করেছিল এবং গোপালকে ধরে এনে, হাকিমের সুমুখে খাড়া করে দিল। হাকিম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি চুরি করেছ?
গোপাল বললে, কেন মিছে কথা বাড়ান। করেছি কিনা সেইটিই তো বিচার করে প্রমাণ করবার ভার আপনার উপরে।
ধনী হবার সহজ উপায়
গোপালের বুদ্ধি প্রখর। একবাক্যে সকলে তা স্বীকার করত। তারজন্য গোপালের সঙ্গে নানান ধরনের লোক প্রায়ই দেখা করতে আসত।
একবার এক ভদ্রলোক এসে গোপালকে জিজ্ঞেস করল গোপাল, তোমার তো এত বুদ্ধি। তোমার বুদ্ধির জোরে আমাকে বিনা পুজিতে ধনী হবার সহজ উপায় বাৎলে দিত পার?
গোপাল হেসে বলেনে, ধনী হবার সহজ উপায় বাতলে দিতে পারি, ফি বার করুন দশ টাকা। আপনিও এরপর এইভাবে দেশবিদেশে, প্রতিবেশীদের কাছে চাউর কেরে দিন যে অল্প অল্প দক্ষিণায় ধনী বানানোর মন্ত্র আপনি জানেন। লোকের ভিড় আপনার কাছে ভেঙ্গে পড়বে। শর্ট-কাটে ধনী কে না হতে চায় বেকুব ছাড়া? আপনি সকলের কাছ থেকে এইভাবে ধনী বাননোর ফরমুলা বাতলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি দশটা করে টাকাও আদায় করতে পারেন তাহলে আপনি বিনা পুজিতে অতি সহজেই ধনী হয়ে যাবেন। ধনী হবার সহজ উপায় আপনি আর পাবেন না। বিশ্বাস না হয় পরীক্ষা করেই দেখুন না, মিথ্যে বলছি কি সত্যি বলছি। এই বলে গোপাল মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।

বিনি পয়সায় মেলা
একবার গোপাল আহ্লাদ পুরে বেড়াতে এসেছিল। নতুন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এক অজানা দেবস্থানে উপস্থিত। সেদিন ছিল উৎসব তিথি। সামনে বিরাট আটচালা সাজানো। মধুর বাজনা বাজছে, গানও শোনা যাচ্ছে। পেছনে মন্দির দেখা যাচ্ছে না সামনে থেকে। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকরা প্রবেশ করছেন ভিড় করে দলে দলে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গোপাল তাকিয়ে আছে সেইদিকে। তার বড় ইচ্ছে, সেও একবার ভিতরে গিয়ে দেখে, কি জাতীয় তামাসা ওখানে হচ্ছে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলে, এখানকার টিকিটের দাম কত ভাই?
দারোয়ান বললে, সে কি? এখানে তো কোন টিকিট লাগে না! বিনি পয়সায় মেলা দেখা যায়।
গোপাল যেন অকূলে কূল পেয়েছে — এইভাবে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল তাই, বলো। ভেট লাগে না বলেই এত ভিড়। এই বলে গোপালও ঢুকে পড়ল ভিড়ের মাঝে আনন্দের লোভে।
বিশুদ্ধ নবগ্রহ সিদ্ধ পঞ্জিকা
শ্রী গোপাল উবাচ- উদ্ভটচন্দ্র জ্যোতিষ রন্তা শাস্ত্রীজী নববর্ষের যে বিশুদ্ধ নবগ্রহ সিদ্ধ পঞ্জিকা প্রকাশ করেছেন, তার গোড়ার পর্বে দেশগত বর্ষফল এইভাবে গুঞ্জিত-
১. দেশের অবস্থা রকম ফেরে মন্দই যাবে না। কেউ খেতে পাবে কেউ পাবে না, কেউ চাকরিতে বহাল হবে, কেউ আবার বরখাস্তও হতে পারে।
২. গঙ্গার জলে ইলিশ কিছু পড়বে। আগের বারের চেয়ে কম হওয়ারই সম্ভাবনা। তবে কিছু বেশি হলেও অবাক হবার কিছু নেই, কারণ কতকগুলি শুভগ্রহেরও যোগাযোগ আছে। (কালির প্রভাবে পুকুরের ইলিশও স্থানবিশেষে বেশ মিলতে পারে।)
৩. বর্তমান গবুচন্দ্রের গৌরী সেন সরকারই টিকে থাকবেন, যদি না অসাধারণ কোন কোপ গ্রহ সন্নিবেশে আচমকা ওলোট পালোট না হয়ে যায়। আর বর্তমান গবু কানুন বহাল থাকলে হবুচন্দ্রই প্রধান অমাত্য থাকবেন, অবশ্য যদি না তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, বা দলের লোক তাকে ঠেঙ্গিয়ে অন্য কোন সরেস হারাচাঁদ বা পাটোয়ারী লালকে দলপতি বলে মনোনীত না করে!
৪. মাঝে মাঝে যান দুর্ঘটনা হবে, গরুর গাড়ি চাপা বা মানুষ চাপা পড়েও কিছু কিছু লোক মারা যেতে পারে!
বৃষ দোহন
কোনও একবদমাইস লোকের প্ররোচনায় মহারাজ একদিন গোপালকে আদেশ দিলেন, একটা বৃষ দোহন করে, তার দুধ আমায় কাল এনে দাও। গোপাল যত বলে যে, বৃষ দোহন করে দুধ পাওয়া যেতে পারে না, মহারাজ সে কথায় কান দিলেন না মোটেই। অগত্যা গোপালকে বেরুতে হল।
গোপালের মত ধুরন্ধর লোক টো টো করে ঘুরে কোন উপায় না বের করতে পেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবতে থাকে, কি করে এ যাত্রা বাঁচা যায়। গোপাল কোনও বুদ্ধিই মাথায় খাটাতে পারল না।
গোপালের স্ত্রী স্বামীর এই রকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখে বিষ্মিত হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে। গোপাল বলে, মহারাজ আমাকে বৃষ দোহন করে দুধনিয়ে যেতে আদেশ দিয়েছেন। কি যে করি। কোথায় যাই, কে আমাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করবে ভেবেই কুলকিনারা কোনও পাচ্ছি না। যদি ষাঁড়ের দুধ দিতে না পারি গর্দান যাবে। নিশ্ছয়ই মহারাজ কারো প্ররোচনায় এমন অসম্ভব কাজ আমার ঘাড়ে চাপিয়েছেন। এখন কি করে রেহাই পাওয়া যাবে ভেবে স্থির করতে পারছি না।
গোপালের স্ত্রী স্বামীকে বললে, তুমি কাল আর বেরিয়োনা। যা করবার আমি করছি। এই সামান্য কাজের জন্য এত চিন্তা। গোপালের স্ত্রী গোপালের চেয়েও সরেস বুদ্ধি ধরে কখনও কখনও। পরদিন খুব ভোরবেলাতেই রাজবাড়ির সম্মূখে নদীর ঘাটে গিয়ে গোপালের স্ত্রী গাদা গাদা কাপড় সশব্দে কাচতে লাগলে।
ওইখানটিতে মহারাজ রোজ সকালে ভ্রমণ করেন। তিনি কাপড় কাচার শব্দ শুনে ভাবলেন এ সময় এখানে কিসের শব্দ? কাছে এসে দেখলেন, এক পরমা লাবণ্যবতী মহিলা ধোপানীর মত কাপড় কাচতে ব্যস্ত। দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ দেখলেন, আকৃতি দেখেই বুঝতে পারলেন এ নারী কোনো বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বংশের মহিলা। তিনি সবিস্ময়ে বললেন, ভদ্রে! এই কঠোর শ্রমের কাজ দাসীতেই করে। আপনি নিজে এই কাজ করছেন কেন? এর কারণ জানতে আমার একান্ত ইচ্ছে করছে, যদি বলেন খুবই আনন্দিত হব।
গোপাল মহিষী বললেন, কি করবো বলুন বাবা দাসীর অসুখ করেছে। অথচ নতুন দাসী খুঁজে আনবার সামর্থ আমার স্বামীর আজ আপাততঃ নেই। কারণ, তিনি প্রসব বেদনায় একান্ত কাতর। কাপড় সিদ্ধ হয়ে গেছে, কাজেই নিজে কাপড় কাচা ছাড়া আর উপায় কি? ঘরে আর কেউ নেই যে কাজটুকু করে দেয়। ২/১ দিন ভেজা কাপড় ফেলে রাখাও যায় না নষ্ট হয়ে যাবে।
মহারাজ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, স্বামী প্রসব-বেদনায় কাতর? একি অসম্ভব কথা বলছেন আপনি? পুরুষেরা কি সন্তান প্রসব করতে পারে? এ আমি আপনারমুখে ছাড়া কোথাও কোনওদিন দেখা দুরের কথা শুনিনি।
গোপালের স্ত্রী বললেন, কেন হবে না? যে দেশে বৃষ দোহন করলে দুধ পাওয়া যায় সে দেশে পুরুষের পক্ষে সন্তান প্রসব করা কি এতই অসম্ভব। আজ শুনলাম আমাদের মাননীয় মহারাজ আদেশ দিয়েছেন একজনকে বৃষ দোহন করে দুধ আনতে-
মহারাজ নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং অনুমান করলেন ইনি গোপালের স্ত্রী। তখন নিজে গোপালের বাড়ি গিয়ে গোপালকে ডেকে, প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। এবং সুকৌশলে এই ভুল ভাঙানোর জন্য গোপালের স্ত্রীকে বেশ ভালভাবেই পুরষ্কৃত করলেন এবং যার প্ররোচনার তিনি গোপালকে এই কাজের জন্য বিড়ম্বিত করেছিলেন, তাকেও প্রচুর জরিমানা করেন।

গৌরী সেন
গোপাল এক মুদি দোকান থেকে ধারে প্রায়ই মাল নিত, কিন্তু টাকা শোধ করতে চাইত না। লোকটি খুব সরল প্রকৃতির ছিল। গোপাল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পেয়ারের লোক বলে দোকানি ও টাকা চাইতে সাহস পেত না যদি রাজ রাগ করেন তাহলে গেছি।
একদিন দোকানির ভীষণ টাকার দরকার, বাড়িতে অসুখ! গোপাল মাল নিতে এলে দোকানি বললে, ধারে তো রোজই মাল নিয়ে যাচ্ছেন, টাকাটা আমার আজ দরকার আছে, দেবেন?
দোকানির কথা শুনে গোপাল মুচকি হেসে বললে, আপনার কাজ মাল দেওয়া-দিয়ে যান, আমার কাজ মাল নেওয়া-টাকা যে দেবার সেই দেবে ভাই!
দোকানি বলল, সেকথা বললে কি চলে দাদা? টাকা কে দেবে তাই বলে মাল নিলে ভাল হয়। আমাকে আর ভাবতে হয় না।
গোপাল তখন মাথা চুলকে বললে, টাকা আবার দেবে কে? টাকা দেবে গৌরী সেন।
গৌরী সেনের নাম দোকানি কখনও শোনেনি, সে তাই বললে তিনি আবার কে? দোকানী মনে করল হয়ত গৌরীসেন মহারাজের কোষাগারের কোনও লোক বা কেউ কেটা।
গোপাল বলল, তাজ্জাব ব্যাপার! সবাই যাকে চেনে, তুমি তাকে চেনো না? মালটা দিয়ে দাও। তো বাপু তারপর যাকে জিজ্ঞাস করবে, সেই তোমায় গৌরী সেনের ঠিকানা বাতলে দেবে। তার কাছে দিয়ে আমার নাম বললেই টাকা সঙ্গে সঙ্গেই পাবে।
দোকানী গৌরী সেনের মত লোকের কথা না জানার জন্য লজ্জা পেল ও ঝটপট যা যা মাল বলল সে মাল দিল।
গোপালের পায়ে ফোঁড়া
গোপালের একবার পায়ে ফোঁড়া হয়েছিল। সেজন্য গোপাল খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে রাজসভায় ঢুকতেই মহারাজ বললেন, গোপাল, কখন যে তুমি পরের বাগানে ঢুকে চুরি করতে দিয়ে ঠ্যাঙ ভাঙলে, আমি মোটেই টের পেলুম না।
গোপাল মুচকি হেসে বললে, হুজুর আপনিও আমার সঙ্গে সেই পেয়ারা বাগানে ঢুকেছিলেন। কিন্তু আপনি গাছে ওঠেননি বলে মোটেই টের পাননি। আপনি তখন তলায় পেয়ারা গুনছিলেন। আপনি অগুনতি পেয়ারা দেখে মশগুল ছিলেন গোনায়-এজন্য আমি যে পড়ে দিয়ে ঠ্যাং ভাঙলুম তা দেখতে পাননি, আপনি টের পেলেরন আজ। হুস থাকলে ত দেখবেন।
সুদ ছাড়তে দিয়ে ব্যবসা কখনো মাটি দেব না
গোপাল ভাঁড় একদা খেয়া নৌকা করে পারে আসছিল। তোড়ে জোয়ার আসার সময় গোপাল খেয়া নৌকা থেকে জলে পড়ে গেল মাঝনদীতে। পড়েই নাকানি চোবানি খেতে লাগল। ভীষণ স্রোত, তাই কেউ তাকে তোলবার জন্যে, জলে ঝাঁপ দিতে সাহস করল না। একখানা ডিঙ্গি আসছিল পাল তুলে, তা থেকে মদন মাঝি, দেখতে পেয়ে লাফ দেয় পড়ে গোপালকে টেনে তুলল তার ডিঙ্গিতে।
আগে চিনতে পারেনি, এখন দেখলে, তার মহাজন গোপাল ভাঁড়কে সে বাঁচিয়েছে। গোপালের কাছে মদন মাঝি কিছু টাকা দেনা করেছিল। আশা হলো, তাহলে দলিলখানা হয়তো গোপাল অমনি অমনি ফেরত দিতে পারে। মদন মাঝি এই আশায়ই মনে মনে ফাঁদছিল।
কিন্তু গোপালের প্রথম কথাতেই সে নিরাশ হলো। গোপাল বলল, তুমি আমায় বাঁচিয়েছো মদন। আমিও দরকার হলে তোমার জন্য প্রাণ দেব। কিন্তু তা বলে সুদ ছাড়তে দিয়ে ব্যবসা কখনো মাটি দেব না।
গোপালের প্রাঞ্জল কথা শুনেই মদন সরকারের প্রাণ জল, তার আশার গুড়েবালি। হায়রে! আসল ছাড় তো দুরস্থান সুদের ঠ্যালাতেই মদনের লবেজান। পরে গোপাল তার দলিল ফেরৎ দিয়েছিল
গোপালের বিয়ে
গোপালের সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে। এক বাদলার দিনে স্ত্রীকে দেখবার জন্যে তার মন ছটফট করে উঠলো। নতুন বৌ তখন পিত্রালয়ে, শ্বশুরবাড়িও প্রায় দুক্রোশের উপর। গোপাল ওই বাদলাতেই দুই ক্রোশ পথ ভেঙ্গে সন্ধ্যা নাগাদ শ্বশুরবাড়ীতে পৌছাল।
জামাইকে পেয়ে শ্বশুরবাড়িতে খুব ধুমধাম। সেকালে রসিকতার ক্ষেত্রে পাত্রপাত্রী বাছ বিচার বড় একটা ছিল না। শ্বশুর-জামাই, শাশুড়ী-পুত্রবধুতেই মোটা রসিকতার আদান প্রদান অবাধেই চলতো। বাদলার দিনে হঠাৎ গোপালকে দেখে গোপালের শ্বশুর খুব খুশি হল। তাই সে একটা রসিকতার প্রলোভন সংবরণ করতে পারলে না। সকলের সামনেই জিজ্ঞাসা করলে, আজকের মতন বাদলায় কি ভাল লাগে, বলো দিখে কে বলতো পারো? যেবলবে তাকে ৫০ টাকা পুরষ্কার দেবো।
গোপালের শ্বশুরের অবস্থা বেশ ভালই। গোপাল মুখফোঁড় লোক বলে উঠল আজকের মত বাদলায় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বৌয়ের সঙ্গে হাসি আর গল্প করতেই ভালো লাগে। এর চেয়ে আর কি ভাল লাগতে পারে।
ঠিক এই কথাটিই শোনবার প্রত্যাশা করছিল শ্বশুর। কিন্তু সে অমনি বলে উঠল, কথাটা ঠিক, কিন্তু তার চাইতেও ভালো লাগে বেয়াই বাড়ি দিয়ে বেয়ানের সঙ্গে গল্প করতে। বল-বাবাজী তোমার চেয়েও এটা আরও বেশ ভাল নয় কি?
গোপাল অমনি দাঁড়িয়ে চাদর কাঁদে তুললে, বললে, তাই না কি? তা জানলে তো আমি না এসে, বাবাকে পাঠিয়ে দিতাম। তা এখনও রাত বেশি হয়নি, আমি গিয়ে বাবাকে এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি এসে বেয়ানের সঙ্গে গল্প গুজব আমোগ আহ্লাদ করুন। আমি যত তাড়াতাড়ি পারব ছুটতে ছুটতে বাড়ি যাব।
শ্বশুরের মুখ ভোতা। দেতো হাসি বের করে বলে। তোমার এখন বৃষ্টির রাতে যেতে হবেনা বাবা। ভিতরে গিয়ে বিশ্রাম কর। গোপাল মুচকি মুচকি হাসতে থাকে, বৌ এর দিকে তাকিয়ে মনের মত কথার জন্য মন বেশ খুশী।
গোপালের মেয়ে জামাই
গোপালের স্ত্রী সব সময় বায়না ধরত–মেয়ে জামাইকে আনবার জন্য। একদিন স্ত্রী জিদ ধরল ওদিকে যাচ্ছে যখন, মেয়ে জামাইকে নিয়ে এসো। সবাই কেমন সাধ আহ্লাদ করে। কিন্তু আমরা এসব করতে পারি না।
স্ত্রীর কথা শুনে গোপাল ভাবল, জামাইরা যত বাড়িতে না আসে ততই ভালো। জামাই আনা মানেই হাতির খরচ। আর বাবাজী একবার এলে হঠাৎ বিদায় হয় না। মুখে বলল, এই তো মেয়ে জামাই ছমাস আগে এসে ঘুরে গেল। এর মধ্যে আবার আসবে কি? এলেই দুমাসের ধাক্কা। আমার এখন অবস্থা খুব খারাপ। টাকা রোজগার ভাল যাচ্ছে না। মেয়ে জামাই এলে সংসারের ধাক্কা সামলাব কি করে? এখন থাক, ২/১ মাস পরে আসবে।
গোপালের স্ত্রী রেগে বলল, তুমি কি হাড় কেপ্পন গো। এমন শ্বশুর যেন কারও না হয়। ভগবানের করুনায় আর মহারাজের কৃপায় তোমার কিসের অভাব? গোপালের স্ত্রীর নানা কথা বলে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলে। তাই বাধ্য হয়ে গোপাল লোক পাঠাল মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে আসার জন্য।
মেয়ে জামাই ঠিক সময়ে এলো। কিন্তু জামাই শ্বশুরবাড়িতে রোজ চব্যচোষ্য লেহ্য পেয় আদরে পেয়ে আর যাওয়ার নামটি করে না একেবারেই। জামাই যেতে চাইলেও গোপালের স্ত্রী ছাড়তে চায় না কিছুতেই। এই তো এলে বাবা। এখনই যাই যাই করছ কেন? দুমাসের আগে তোমাদের কিছুতেই ছাড়ব না এবার। তোমার বাড়িতে কী দরকার যে বাড়ি না গেলে চলবে না, এখন যাওয়া চলবে না।
এদিকে খরচের বহর দেখে গোপাল রোজই চোখে সর্ষে ফুল দেখতে লাগল। অবশেষে গোপাল ভেবে চিন্তে একটা বেশ মনের মত উপায় আবিষ্কার করে ফেলল মনে মনে। গোপাল একদিন বিকেলবেলা জামাইকে একান্তে ডেকে বলল, বাবাজী, এখানে বড় ছিঁচকে চোরের উৎপাত। ছিঁচকে চোরের জ্বালায় গাছে লেবু রাখা দা। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যের সময় ব্যাটা চোর এসে লেবু তুলে নিয়ে যায়। আমি সাবধান হয়েও চোরকে আজ পর্যন্ত ধরতে পারিনি। যদি বা ধরা যেত- আমি আবার সব সময় বাড়িতে থাকি না কি করে চোর ধরব তুমি সব সময় বাড়িতে থাক দেখ যদি চোর ধরতে পার কিনা। তুমি বাবজী, সন্ধ্যের পর বৈঠকখানা ঘরে বসে-লেবুগাছের দিকে একটু নজর রেখো তো। চোরকে ধরলে একেবারে জাটটে ধরবে। লেবু চোর ব্যাটাকে শায়েস্তা না করলে চলছে না। আজকাল লেবুর যা বাজার। বাজারে লেবু পাওয়াই যায় না। এক একটা লেবুর দাম অনেক।
শ্বশুরের কথা শুনে বলে, আপনি কিছু ভাববেন না বাবা। আমার নজর এড়িয়ে চোর কিছুতেই লেবু চুরি করতে পারবে না। চোর তো সামান্য লেবু চুরি করতে আর মাঝ রাতে আসবে না, সন্ধ্যের ঠিক পরেই আসবে। ব্যাটাকে একদিন না একদিন আমি ঠিক ধরে ফেলবো। লেবু-চুরির কথা এর আগে বলেননি কেন আপনি? আমি প্রায় এক মাস এলাম আপনার বাড়ীতে।
সেদিন সন্ধ্যের সময় গোপাল বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে, চুপি চুপি বললে, যাও তো, লেবু গাছ থেকে চট করে একটা লেবু নিয়ে এসো তো। লেবু এনে আমায় সরবৎ করে দাও। আমাকে এখনি একবার রাজবাড়িতে যেতে হবে, যদি কিছু টাকা পয়সা রোজগার করতে পারি। হাত একেবারে খালি।
সেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। ছেলেমেয়েরা বেড়াতে গেছে। কোন লোক না থাকায় গোপালের স্ত্রী অন্ধকারে নিজেই লেবু আনতে গেল। ছেলেমেয়েদের গোপাল কায়দা করেই আগে থেকে বেড়াতে পাঠিয়ে দিয়েছিল যাতে, জামাই ছাড়া বাড়িতে আর কেউ না থাকে। কেউ উপস্থিত থাকলে কাজ হবে না। জামাই শ্বশুরের কথা মত ওঁৎ পেতে বসে ছিল। যেমনি গোপালের বৌ লেবু পাড়তে ঢুকেছে অমনি জামাই অন্ধকারে চোর ভেবে শ্বাশুড়ীকে জাপ্টে ধরল কষে। এমন জাপ্টে ধরল যে শাশুড়ী কোনও মতে পালিয়ে যেতে পারল না। টানা হ্যাঁচড়া করতে করতে জামাই চেঁচাল আজ তোর লেবু-চুরি করা বের করছি। তুমি ভারি ঘুঘু-না। রোজ রোজ লেবু চুরি করার মজা তোমায় দেখাচ্ছি। তুমি মনে করেছ, কেউ বাড়িতে নেই?
গোপাল এই অবস্থার জন্য তৈরিই ছিল। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তাড়াতাড়ি ঘরের হ্যারিকেনটা নিয়ে ছুটে গেল। গিয়ে দেখল জামাই বাবাজী তখনো শাশুড়ীকে কষে জাপ্টে ধরে রয়েছে। শাশুড়ী প্রাণপণে জামাইয়ের হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না দু-জনের মধ্যে ঝাপটা ঝাপটি হচ্ছে। তাই দেখে গোপাল বললে, তাইতো বলি- জামাই আনার এত শখ কেন? এবার বুঝতে বাকি নেই।
এই ঘটনায় শাশুড়ীও যেমন লজ্জা পেল, জামাই ও তেমনি লজ্জা পেল। তারপরদিন জামাই লজ্জায় সেই যে মেয়েকে নিয়ে চলে গেল-তারপর আর শশুরবাড়ি এল না। গোপালের স্ত্রীও মেয়ে জামাইকে আনার কথা আর মুখ ফুটে গোপালের কাছে কোনওদিন উন্থাপন করতে পারল না। গোপাল সকলের মেয়ে জামাই এলে কেবল মুচকি মুচকি হাসে আর তাকে স্ত্রীকে দেখে।